নীরবতা, অশ্রু ও এক মিনিট বিশ সেকেন্ডের বক্তব্য

লেখক: প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সোলায়মান ট্রেজারার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

খালেদা জিয়ার জানাজা দুপুর দুইটায় অনুষ্ঠিত হবে এ তথ্য জানা থাকলেও সকাল থেকেই এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল। কখন কফিনের কাছে যাওয়া যাবে, আদৌ যাওয়া যাবে কি না এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সকাল দশটায় রওনা দিয়ে পৌঁছাই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়।

কফিনের কাছে যাওয়ার সুযোগ আদৌ হবে এটা ছিল অনেকটাই দুরাশা। তবু মানুষের স্রোতের সঙ্গে আমিও যুক্ত হলাম। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার মাঠে অবস্থান নিলে মঞ্চ থেকে মাইকে ভেসে আসছিল বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায়, সংগ্রাম ও অবদান নিয়ে বক্তব্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে আর লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় সংসদ ভবন থেকে শুরু করে মানিক মিয়া এভিনিও হয়ে পুরো ঢাকা।

রোদ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং একই ধরনের বক্তব্য বারবার শোনার কারণে উপস্থিত অনেকের মধ্যেই এক ধরনের ক্লান্তি ও অধৈর্যতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। অনেকেই নিজেদের মধ্যে বলছিলেন এসব তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু যখন দুপুর দেড়টা বেজে গেল তখন যোহর নামাজ নিয়ে মানুষের মাঝে বিড়ম্বনা তৈরি হল যে, নামাজ কি জামাতে হবে না একা একা পড়তে হবে। এ বিষয়ে মাইকে ঘোষণা না দেওয়ায় অনেকেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলো। তারপর যার যার মত করে নামাজ আদায় করল।

দুপুর তিনটায় যখন খালেদা জিয়ার কফিন নির্ধারিত স্থানে আসলো এবং মাইকে ঘোষণা হলো বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বক্তব্য রাখবেন, তার দৃঢ় আবেগপূর্ণ বক্তব্যে পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেল লাখো মানুষের সমাবেশ। আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগের স্মৃতিচারণে বহু মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।

তারপর ঘোষণা আসলো বক্তব্য রাখবেন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। আমার মনে কেন যেন সায় ছিল, তিনি কথা বলবেন খুবই কম। বাস্তবেও তাই হলো। মাত্র এক মিনিট বিশ সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেই তিনি উপস্থিত জনতার আবেগ স্পর্শ করেন। সেই বক্তব্যে কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না, ছিল না স্লোগাননির্ভর আহ্বান।

বক্তব্য শেষ হতেই আশপাশে অনেকের মুখে নানা কথা শোনা যাচ্ছিল। কারও ভাষ্যে উঠে আসে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রসঙ্গ, কারও কথায় আবেগ ও প্রত্যাশার প্রকাশ। আমার মনে হলো, এই ঐতিহাসিক বিদায়ের মুহূর্তে, নীরবতা ও অশ্রুর ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নটি যেন নতুন করে প্রতীকী রূপ পেল।